no views

মেধাপাচার!

লিখেছেন

মোঃ তরিকুল ইসলাম
পিএইচডি ক্যান্ডিডেট
ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ, ইউএসএ

বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল বিশ্বে মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন নামে একটা পপুলার ধারণা চালু আছে কিন্তু দুঃখজনকভাবে খুব কন মানুশ-ই আছে যারা এব্যাপারে ক্রিটিকালী চিন্তা করতে পারে। ক্রিটিকালী চিন্তা করার পূর্বশর্ত হল নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করা এবং তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা। কিন্তু বাংলাদেশে মূল ধারণার চেয়ে ভুল ধারণা অতি দ্রুত প্রসারিত হয় কারণ এখানে মানুষের ভিতর ক্রিটিকাল থিঙ্কিং এর ধারণাটায় নেই যেটা আছে সেটা হল আবেগ নির্ভর কিছু মুখস্থ বুলি যেটা অনেক শিক্ষিত মানুষও দিনের পর দিন আওড়ে যান কিন্তু সত্য কি মিথ্যা, যতার্থ কি অযৌক্তিক এটা কখনও ভেবে দেখেন না। যাহোক মেধা পাচার বোঝার আগে যে প্রশ্নগুলির উত্তর জানা জরুরী তার ভিতর হল, মেধা পাচার কি বা এই শব্দটা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্তর্নিহিত কারণ কি এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বা সমাজের দায় কতটুকু?

প্রথম আলোচনা করা যাক-

বাই ডেফিনিশন মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন বলতে যেটা বোঝায় সেটা হল স্বল্পোন্নত দেশের উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ মানুষজন যখন উন্নত জীবনের আশায় উন্নত বিশ্বের কোনো দেশে স্থায়ীভাবে ইমিগ্রেট করে। ব্রেইন ড্রেইন রুট লেভেল থেকে বুঝতে হলে এই ডেফিনিশন টা বোঝা খুব-ই জরুরী। একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ বা দক্ষ কর্মী তৈরী করতে যেকোনো রাষ্ট্রের অনেক রিসোর্চ ইনভেস্ট করতে হয়। সেক্ষেত্রে আমি স্বীকার করি এমন একজন মানুষ স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করলে এটা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যারা উন্নত দেশে যার তাদের অধিকাংশ অনার্স পাশ করে চলে যায় এবং সেসময় তাদেরকে মোটেও উচ্চশিক্ষিত বা দক্ষ কর্মীদের কাতারে ফেলার আমি পক্ষপাতী না। যদি আমার কথায় ধরি, আমি অনার্স পাশ করার পর যখন দেশ ছাড়ছি সেসময় দেশে যদিও চাকরীর চেষ্টা করিনি তারপরও আমি জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট হওয়ার পরও আমার পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়ার মত ছোটখাট একটা চাকরী যোগানোও আমার জন্য দুঃসাধ্য হত। এর পর আমি যে এখানে পড়তে আসছি এটা পুরোটায় আমেরিকার টাকা অর্থাৎ এখানে দেশের টাকায় পড়ে বিদেশ সেবা করার প্রশ্নটায় আসেনা। দ্বিতীয়ত, আমি এখানে থাকলেও আমার পুরো পরিবার দেশে থাকে অর্থাৎ আমি প্রতিমাসেই কমবেশি কিছু পরিমাণ টাকা দেশে পাঠায় যার অর্থ দাড়ায় আমি দেশের ইকোনমিতে ডিরেক্টলি কন্ট্রিবিউট করছি। আজকে আমরা যে দেশের উন্নয়ন উন্নয়ন করে গলাবাজি করি একবার ভেবে দেখেছেন এটা কাদের অবদান? এই অবদান এই দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক আর মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কন্সট্রাকশন কর্মীদের।

আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি তখন একবার শুনলাম বাংলাদেশের অ্যাপোলো হাসপাতালে একজন ইন্ডিয়ান ডাক্তার আছে তার মান্থলি স্যালারি ৮ লক্ষ টাকা! এরকম কথা শোনার পরও অনেকের অনেক রকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে কিন্তু আমার তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ছিল- “তার মানে একজন মাত্র মানুষ প্রতি মাসে আমার দেশের ৮ লক্ষ টাকা তার দেশে নিয়ে যাচ্ছে?! আমরা কি পারিনা আমাদের নিজের দেশের মানুষগুলো এই পোস্টে বসাতে তাহলে দেশের টাকাটা দেশে থাকতো! আমরাও বিদেশে পাঠায় কিন্তু কাদের? আমরা যাদের পাঠায় তারা মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে যেয়ে মাসে পায় ২০ থেকে ৩০ হাজার। থাকা খাওয়া বাদ দিয়ে দেশে পাঠায় ১৫-২০ হাজার, অর্থাৎ, ওদের একজন আমাদের দেশের যে টাকা নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের ৪০ জন লাগছে সেটা করতে! এটা ভাবলেই আমার কান্না পায়! তখন থেকে আমি ভাবতাম আমরা কি পারিনা আমাদের দেশের মানুষদেরকে আমরা শ্রমিক হসেবে না পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ করে পাঠাতে? কেমন হত যদি বিশ্ব আমাদেরকে শ্রমিক হিসেবে না চিনে বড় বড় ইউনিভার্সিটির নামজাদা সব প্রফেসর বা কর্পোরেট কোম্পানি গুলোর চিফ এক্সিকিউটিভ হিসেবে চিনত?

আরেকটা গুরত্বপূর্ণ দিক হল আমাদের দেশে যে পরিমাণ গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট প্রতিবছর বের হয় সে তুলনায় চাকরির বাজার খুবই অপ্রতুল আর এই সমস্যা উত্তরণে আমাদের উচিৎ বাইরের দেশে সেখানেই সুযোগ আছে এক্সপ্লোর করা। কিন্তু আমরা উল্টা করি প্রতি পদে পদে বাধা সৃষ্টি করি! সব বাধা অতিক্রম করে যখন দেখি উন্নত দেশে কেউ অনেক বেশি সাকসেসফুল হয়ে গেছে তখন দেশবাসীর কাছে দুইটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়- ১) একশ্রেণি আছে আওড়াতে থাকে আমাদের দেশের ছেলেমেয়ে আজ বাইরে বিরাট সাফল্য অর্জন করছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা ইউরোপ আমেরিকার ইউনিভার্সিটি কাপিয়ে বেড়াচ্ছে, সব আমাদের অবদান, আমরা নিজ হাতে গড়ে দিয়েছি! আরে বেটা দেশে থাকতে তো পাত্তাই দিসনি এগুলোরে! ২) আরেক শ্রেণী হিংসায় জলতে থাকে আর গালি দিতে থাকে; বলে ইহ! দেশের টাকায় পড়ালেখা করে দেশকে ভুলে যেয়ে এখন বিদেশের তাবেদারি করছে! এসব বলে বা ফেসবুকের পোস্ট বা কমেন্টে ঝড় তুলে তারা বিরাট দেশপ্রেমিক বনে যান!

তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর একটা কুফল আছে যেমন- কেউ যদি তার পুরো ফ্যামিলি নিয়ে মুভ করে দেশে কোনো টাকা না পাঠায় বা বিদেশেই সব খরচ বা ইনভেস্ট করে সেক্ষেত্রে এটা দেশের জন্য একটা বামার। কিন্তু প্রশ্ন হল এটা যারা করে তারা হল সংখ্যালঘু আর মাথামোটা উচ্চবিত্ত শ্রেণি, তারা বিদেশের নাগরিক হতে পারাটা তাদের জীবনের অনেক বড় সাফল্য মনে করে। তাদের অধিকাংশ বিদেশে পড়ে বিদেশ সরকার বা ইউনিভার্সিটির টাকায় না। তারা দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে নিজের খরচে পড়ে। এটা দেশের টাকা বিদেশে যাওয়ার আরেকটা পাইপলাইন। খোঁজ নিয়ে দেখবেন দেশের মন্ত্রী (ভৃত্য) এমপিদের ভিতরে এরকম বেশি পাবেন কিন্তু এটা আমাদের মত সংখ্যা গরিষ্ঠরা না, কারণ আমাদের সে সামর্থ্য নাই। আমাদের যা করতে হয় সেটা মাথার জোরেই করতে হয়।

অন্তর্নিহিত কারণ কি সমাজ বা রাষ্ট্রের যায় এবং?

সাধ করে কেউ চাইনা দেশ, পরিবার-পরিজন ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকতে। সুযোগ পেলে সবাই চায় নিজের দেশে থাকতে দেশের জন্য কিছু করতে। কিন্তু, আমাদের দেশে মেধাবী স্টুডেন্ট দের বা মানুষদের ফিরিয়ে আনার কি কি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? আমি এখন যেখানে আছি আমি হয়ত ভবিষ্যতে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হওয়ার যোগ্যতা রাখি কিন্তু আমি চাইলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার হতে পারবোনা! যে দেশে বিটিভির উন্নয়নে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার বাজেট হয় (একটা উদাহরণ মাত্র চাইলে হাজারটা দেওয়া যাবে), সেদেশে জ্ঞ্যান বিজ্ঞ্যান গবেষণায় টাকা পাওয়া যায়না। সেদেশে সায়েন্টিফিক রিসার্চ প্রপোজাল ইভ্যালুয়েট করা বা রিসার্চের ফান্ড কোথায় দিতে হবে আর কোথায় দিতে হবেনা সেটা ভির্ভর করে সচিব আর ভৃত্যদের ফোন কলের উপর। আমি এবারো দেশে যাওয়ার পর কিছু স্যার চাইছিলেন আমি যে বিষয়ে রিচার্স করি তার উপর ডিপার্ট্মেন্টে একটা সেমিনার দেই। ডিপার্ট্মেন্টের চেয়ারম্যান আমার মুখের উপর বলে ঐসব জ্ঞ্যান ট্যান আমাদের লাগেনা, আমরা স্যাচুরেটেড। সরকারি অফিসের কথা নাই বললাম! পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেছিলাম সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লে এখনও জ্বর আসে! আমার কথা হল হুম বিদেশে কর্মরত সব মেধাবী মানুষগুলো দেশে ফিরে আসবে দেশ কি তাদের নেওয়ার জন্য প্রস্তুত? দেশে অভাব থাকলে সবাই মিলে একবেলা করে না খেয়ে থাকব কিন্তু অর্থের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, মেধার অবমূল্যায়ন এগুলোর প্রতিকার কোথায়?

মোঃ তরিকুল ইসলাম
পিএইচডি ক্যান্ডিডেট
ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ, ইউএসএ

Leave a Reply