লিখেছেন
চন্দ্র নাথ
মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
১) আমরা যারা দেশের বাইরে বাচ্চাদের বড় করছি, তারা জানি দেশে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা কি মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে প্রতিটা দিন পার করে! যারা বাংলাদেশে পড়ে বড় হয়ে এখন বাইরে আছি তাদের প্রায় সবাই উন্নত দেশ যেমন আমেরিকা, জাপান, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুরে বাচ্চাদের স্কুল সিস্টেম নিজেদের চোখে দেখেছি বা বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে জানি। সেগুলো দেখে বা জেনে আমরা নিজেদের সেই সময়কার স্কুল-কলেজের কষ্টগুলোর কথা মনে করি, আর হা-হুতাশ করে নিজে নিজে বা কমিউনিটি প্রোগ্রামে আলাপচারিতায় বলি, “আহ, আমরা যদি আমাদের সময় বাংলাদেশে এই পরিবেশ পেতাম। এরা কি আরামে আছে রে!”
বাইরের দেশের সাথে দেশের কি রকম পার্থক্য?
নিজের মেয়ে ১ম গ্রেডে পড়ছে। গতকাল তার ম্যাথ টেস্ট গেলো, এর একদিন আগে হলো রিডিং টেস্ট। এখানে যেটা আমাকে চমকে দিয়েছে সেটা হলো, স্কুল থেকে বাচ্চাদের বুঝতেই দেয় না তাদের পরীক্ষা কবে হবে! প্রতি পরীক্ষার আগের দিন খামবন্দি করে মা-বাবার কাছে একটা লেটার বা ইমেইলে একটা ম্যাসেজ পাঠায় স্কুলের টিচার। তাও আবার পড়ন্ত বিকেলে। সেখানে লেখা থাকে এরকম – Your child will have the reading test tomorrow. Please make sure that s/he takes rest properly and low sweet breakfast meal in the morning.
পরীক্ষার আগেরদিন আপনাকে এই সহজ-সরল ম্যাসেজটা দিলে আপনি সেটা মানতে বাধ্য। বাচ্চার মলিন মুখখানা দেখে আপনি তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে চাইবেন। এটাই স্বাভাবিক। আচ্ছা, আপনার মন কি কখনো বলবে যে, “কাল বাচ্চার রিডিং বা ম্যাথ টেস্ট, আজ সারারাত ওকে আমি বসে বসে পড়াবো? প্রতিটা বই মুখস্থ করিয়ে ছাড়বো?”
২) দেশে নিজেরা পড়ে এসেছি। স্কুল লেভেলে মূলত গ্রামে পড়েছি। তাই নিজের অভিজ্ঞতা নেই। হাই স্কুল-কলেজের অনেক ছেলেমেয়ে চট্টগ্রামে এবং ঢাকায় পড়ানোর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ওদের পরীক্ষার আগের রাত্রির প্ল্যানও জানতাম। মনে পড়ে আমাদের পাঠ্যপুস্তকেই তো আছে একটা রচনা, “পরীক্ষার আগের রাত্রি”? এটা রচনা করতে গিয়ে আমরা লিখি কত বেশি ব্যস্ত রাত সেদিন কাটাবো। সবারই রাতভর স্বপ্ন, চোখে ঘুম ধরে না। ঘুম গেলে সময় নষ্ট, তার চেয়ে পড়া ভালো। আহ, কাল পরীক্ষা।
এখন আমার ভাই-বোনের ছেলেমেয়েরা দেশের স্কুলে পড়ছে। তাদের থেকে জানতে পারি বাচ্চাদের কী করুণ দশা! আর নিউজ পেপারে তো অনেক সংবাদও আসে। দেখা যায়, ছয়-সাত বছর বয়সী বাচ্চারা বহন করছে প্রায় তাদের নিজেদের সমান ওজনের ব্যাগ। ব্যাগ ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে, তারপরও টানছে পিঠে করে সেই জ্ঞানের সম্ভার!
হুম, এই বাচ্চারা সারাদিন পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। আগে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখার পাশাপাশি গান-নাচ-কবিতা, খেলাধুলা ইত্যাদি করার সুযোগ পেতো। স্কুল থেকে বলা হতো। এখন এসবের কিছুই যেনো নেই। সময় নষ্ট। স্কুল থেকে ফিরে টেবিলে টিচারের সামনে যাও অথবা কোচিং এ যাও। ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে। জিপিএ হতে হবে সোনায় সোহাগা গোল্ডেন ৫।
দিনশেষে কি হচ্ছে? বোর্ডের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত প্রায় সব পরীক্ষায় এখন গুণগত দিক দিয়ে ফেল প্রশ্ন ফাঁস, দেখে লেখা, কিছু লিখলেই পাশ, ইত্যাদির কারণে। এটা জ্ঞানীগুণী সবার কাছ থেকেই এসেছে। তাইলে এই বাচ্চারা এই বোর্ড পরীক্ষার আগে কিসে এত শ্রম দিচ্ছে? গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী এখন ফেসবুকে নিজেদের রেজাল্ট নিজেরাই শেয়ার করছে, যেখানে রেজাল্টের সেই স্ক্রিনশটের সাথে জুড়ে দেয়া এক লাইনের একটা স্ট্যাটাসের প্রায় প্রতিটা শব্দই ভুল অথবা গ্রামারে ভুল। যেমন আজ একজনেরটা নিজের চোখে দেখলাম এরকম, “I am Got Golden GPA 5!!!”
৩) আমাদের দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলতেই পারেন, দেশে এখন অনেক মেধা। আগের চেয়ে কি এখন কম যাচ্ছে দেশের বাইরে? আন্তর্জাতিক বাজারে তো আমাদের ছেলেমেয়ার আগের থেকে বেশি পাচ্ছে বরং।
হুম, সেটা সত্যি। আগের থেকে বেশি আসছে কিন্তু লোকসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে! জ্বি জনাব, এটা সত্যি। যে হারে জিপিএ ৫ পাওয়া বেড়েছে, সে হারে মেধার উৎপত্তি ঘটলে গ্রাজুয়েশনের আগে পড়ে বাইরে আসার বন্যা বয়ে যেতো। গোল্ডেন জিপিএ পেয়েও সুইসাইড করতে হতো না দেশের এতগুলো ভার্সিটির কোথাও চান্স না পেয়ে। ঢাকা ভার্সিটি সহ অন্যান্য ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় এদের বেশিরভাগ পাশ মার্কটাও তুলতে পারছে না।
আমাদের ছেলেমেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বজয় করছে, সেটা ঠিক। কারণ, কিছু ছাত্রছাত্রী তো অত্যন্ত বিশুদ্ধ। শ্রম দিয়েই এসেছে এতটুকু।
৪) দেশের বাইরে বাচ্চাদের পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন হয়? মেয়ে এখন ১ম গ্রেডে। এর আগে ছিলো প্রিস্কুলে। সেমিস্টারের মূল পরীক্ষার পর রেজাল্ট শীট বাসায় পাঠায়। সেখানে যে প্রশ্নগুলোর উপর তারা গ্রেডিং করে সেগুলো দেখলে টাস্কি খাই রীতিমত। এত সুন্দর এদের পাঠদান পদ্ধতি। পোস্ট অনেক লম্বা হয়ে যাবে। তাই আরেকদিন স্ক্যান করে দিব প্রশ্নগুলো।
৫) আমি অতি মাস্টারি করছি বলে মনে করতে পারেন আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ভক্তরা। কিন্তু একটা কথা মনে করিয়ে দেই। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার শুরুটা হয়েছিলো বাইরের দেশ থেকে শিক্ষক ধার করে এনে। বুয়েট আগে যে সার্ভে স্কুল এবং এরপর কলেজ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হলো, সেখানে শুরুতে পাশ্চাত্যের শিক্ষকেরাই পড়িয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন। এখনো উন্নত দেশের কেউ আমাদের দেশ থেকে পড়াশোনা অর্জন করতে যাচ্ছে না, বরং আমাকে এবং আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্য, সৃজনশীলতা বাড়ানোর জন্য বাইরে আসতে হয়েছে। দেশে সুযোগ একেবারে কম। কেউ কেউ নিজেরা সৃষ্টি করছেন সুযোগ, কিন্তু প্রায় সবাই অল্প পরিসরে হলেও বাইরের থেকে কিছু না কিছু ট্রেনিং নিয়ে যায়। আমাদের সিস্টেম টেকসই বা যুগোপযোগী হলে বাইরে আসা লাগতো না। কয়জন আমেরিকান বা ব্রিটিশ ছাত্রছাত্রী বাইরের দেশে পড়াশোনা করতে যায় নিজেদের দেশ ছেড়ে? আমেরিকার আবিস্কার হলো কবে? অথচ এদেশের ভার্সিটিগুলো একেকটা যেনো আদিম কালের। সেই ১৮০০, ১৯০০ সালের প্রায় সব ভালো স্কুলগুলো। তারা কোথা থেকে এই সিস্টেম শিখলো? সব চিন্তার ফারাক কিন্তু? আমরা আর তারা। আমাদের দেশ থেকে যে ক’টা ছাত্রছাত্রী ভালো করছে বাইরে এসেও, এরা দেশের সিস্টেমের বাইরেও নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছে। দেশের সিস্টেম সেটা দেয় নি। দেশের সিস্টেম যদি সেটা দিত, তাইলে উচ্চ শিক্ষার্থে বাইরে আসার জন্য এত বড় বড় লাইন পড়তো না পাশ করার পরপর!
©চন্দ্র নাথ
মিশিগান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে